ধরুন, কেউ আপনাকে বলল — ইতালির কোটায় আপনার নাম লেগে যেতে পারে, টাকা এত লাগবে, আর কাজ ছয় মাসে হয়ে যাবে। সেই মুহূর্তে কথাটা যাচাই করার কোনো মাপকাঠি আপনার হাতে থাকে না — কারণ আপনি জানেনই না, আসল প্রক্রিয়াটা দেখতে কেমন। আর এই ফাঁকটাতেই এজেন্ট কাজ করে।
ইতালির Decreto Flussi আমাদের এখানে “ইতালির কোটা” নামে পরিচিত। ইউরোপের আর কোনো প্রোগ্রামকে ঘিরে সম্ভবত এত ব্যবসা, এত আশা আর এত প্রতারণা জমা হয়নি। তো আসুন, পুরো প্রক্রিয়াটা ধাপে ধাপে খুলে দেখি — কোটার ঘোষণা থেকে click day পর্যন্ত, ভিসা থেকে ইতালি পৌঁছানো পর্যন্ত, আর পৌঁছানোর পর কন্ট্রাক্ট থেকে রেসিডেন্স কার্ড পর্যন্ত। আসল পথটা যখন আপনার জানা থাকবে, নকলটা নিজে থেকেই চেনা যাবে।
ধাপ এক: কোটার ঘোষণা
সরকার একটা ডিক্রিতে ঠিক করে — এ বছর কতজন কর্মী আসতে পারবে, কোন কোন খাতে, আর কোন কোন দেশ থেকে। কোটা মূলত তিন ভাগে ভাগ হয়: stagionale অর্থাৎ মৌসুমি কাজ, যা কৃষি ও পর্যটনের জন্য কয়েক মাসের হয়; non stagionale অর্থাৎ অ-মৌসুমি, যার মধ্যে পড়ে পরিবহন, নির্মাণ, মেকানিক ও ফুড প্রসেসিংয়ের মতো স্থায়ী চাকরি; আর কিছু বিশেষ ক্যাটাগরি — যেমন কেয়ার ওয়ার্ক, বা সেই দেশগুলোর জন্য আলাদা করে রাখা অংশ, যাদের সঙ্গে ইতালির চুক্তি আছে।
এই শেষ কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। যেসব দেশের ইতালির সঙ্গে রি-অ্যাডমিশন বা মাইগ্রেশন চুক্তি আছে, তারা অগ্রাধিকারের কোটা পায়। ঘোষণায় দেশগুলোর তালিকা থাকে, আর এই তালিকা প্রতি বছর এক রকম থাকে না। তাই কারও মুখের কথায় ভরসা না করে প্রতি বছর নিজে দেখুন — আপনার দেশ এ বছর কোন ঘরে আছে।
ধাপ দুই: Click Day — যে দিনটার ওপর সবকিছু দাঁড়িয়ে
নিয়োগকর্তা, বা তার প্রতিনিধি — সাধারণত কোনো consulente del lavoro (শ্রম-পরামর্শক) বা patronato অফিস — আবেদনটা আগে থেকেই অনলাইন সিস্টেমে তৈরি করে রাখে। তারপর নির্ধারিত সকালে, নির্ধারিত মিনিটে সিস্টেম খোলে, আর আবেদনগুলো সময়ের ক্রম অনুযায়ী গৃহীত হতে শুরু করে। কোটা মিনিটের মধ্যে ভরে যায়, কারণ আবেদন থাকে কোটার চেয়ে বহু গুণ বেশি।
এবার এর মানেটা বুঝুন, কারণ এই কথাটা কোনো এজেন্ট আপনাকে বলবে না। আপনার পেছনে যদি একেবারে আসল নিয়োগকর্তাও থাকে — আসল কোম্পানি, আসল চাকরি — তবুও সাফল্যের কোনো গ্যারান্টি নেই। আপনার আবেদন সিস্টেম বন্ধ হওয়ার কয়েক সেকেন্ড আগে ঢুকে যেতে পারে, আবার কয়েক সেকেন্ড পরে বাদও পড়ে যেতে পারে। এটা কার্যত লটারির মতো।
এজন্যই যে লোক আপনাকে “একশো ভাগ” বলে, সে মিথ্যা বলছে — সে যত বিশ্বাসযোগ্যই লাগুক, এমনকি আপনার নিজের পরিবারের লোক হলেও। একশো ভাগ বলে এই প্রক্রিয়ায় কিছু নেই-ই। যে গ্যারান্টি দিচ্ছে, সে হয় নিয়মটা জানে না, নয়তো জানে — আর আপনার কাছ থেকে লুকোচ্ছে।

ধাপ তিন: Nulla Osta
আবেদন কোটায় ঢুকে গেলে প্রদেশের ইমিগ্রেশন ওয়ান-স্টপ দপ্তর, Sportello Unico, যাচাই শুরু করে। তারা দেখে — এই কোম্পানি সত্যিই আছে কি না, ট্যাক্স আর সোশ্যাল সিকিউরিটি দেয় কি না, আর এতজন কর্মী রাখার মতো আর্থিক সামর্থ্য তার আছে কি না। সব ঠিক থাকলে nulla osta (প্রাথমিক অনুমতিপত্র) জারি হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই যাচাই বেশ কড়া হয়ে গেছে, আর কারণটাও সোজা: ভুয়া কোম্পানি আর বিক্রি হওয়া কন্ট্রাক্টের হাজার হাজার কেস ধরা পড়েছে। এখন একাধিক ধাপে নিয়োগকর্তার কাছ থেকে আবার নিশ্চিতকরণ নেওয়া হয়। এটা আপনার পক্ষেই — কিন্তু এটাও মনে রাখুন, কড়া যাচাইয়ের মানে হলো কেনা কাগজ আগের চেয়ে সহজে ধরা পড়ে, আর ততক্ষণে আপনার টাকা চলে গেছে।
ধাপ চার: ভিসা, নিজের দেশে
nulla osta আপনার নামে জারি হয়ে গেলে ইতালির দূতাবাস বা ভিসা সেন্টার ওয়ার্ক ভিসা দেয়। যা যা লাগে, তা চেনা জিনিস: পাসপোর্ট, nulla osta, থাকার ব্যবস্থা আর বাকি সাধারণ কাগজপত্র। এখানেও ইন্টারভিউ আর যাচাই হয়, আর বিশেষ করে দেখা হয় — আপনি সত্যিই সেই মানুষটা কি না, যার জন্য নিয়োগকর্তা আবেদন করেছিল। যেখানে নাম একজনের আর যাচ্ছে আরেকজন, সেই খেলা এখানেই শেষ হয়ে যায়।
ধাপ পাঁচ: ইতালি পৌঁছানোর পর — আসল পরীক্ষা এখানেই
মানুষ ভাবে, ভিসা লেগে গেছে মানে কাজ হয়ে গেছে। আসলে সবচেয়ে নাজুক মোড়টা আসে ইতালির বিমানবন্দর থেকে বেরোনোর পর।
- পৌঁছানোর আট দিনের মধ্যে আপনাকে Sportello Unico-তে হাজির হয়ে নিয়োগকর্তার সঙ্গে বসবাসের চুক্তি (contratto di soggiorno) সই করতে হয়।
- এরপর ডাকঘরের নির্দিষ্ট “কিট”-এর মাধ্যমে রেসিডেন্স পারমিটের (permesso di soggiorno) আবেদন যায়, আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়, আর কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে কার্ড হাতে আসে।
আর এখানেই, এই প্রথম ধাপেই, হাজার হাজার মানুষ প্রতারিত হয়। লোকটা ইতালি পৌঁছায়, ফোন করে — আর “নিয়োগকর্তা” ফোন ধরে না। কখনো নম্বর বন্ধ, কখনো সে এড়িয়ে যেতে থাকে, কখনো অন্য কেউ জবাব দেয়। চুক্তি সই হয় না — কারণ সে কন্ট্রাক্ট বেচেছিল, চাকরি কোনোদিন ছিলই না। আট দিন পেরিয়ে যায়, আর যে মানুষটা আইনি ভিসায় নেমেছিল, সে দাঁড়িয়ে থাকে কাগজপত্র ছাড়া — এমন এক শহরে, যার ভাষা সে জানে না, আর যেখানে তার কাছে ফেরার টাকাটুকুও আর নেই।
এর থেকে বাঁচার উপায় একটাই, আর সেটা সহজ: শুধু সেই আবেদনে সময় আর টাকা লাগান, যার পেছনে একটা সত্যিকারের চাকরি আছে। অর্থাৎ কোনো আত্মীয় বা পরিচিতের আসল নিয়োগকর্তা, বা এমন কোম্পানি, যার সঙ্গে আপনি নিজে কথা বলতে পারেন, যার ঠিকানা দেখতে পারেন, যার নাম নিজে সার্চ করতে পারেন। আপনি যদি আপনার ভবিষ্যৎ মালিকের সঙ্গে একবারও সরাসরি কথা বলতে না পারেন, তাহলে ভাবুন — ইতালি পৌঁছানোর পর সে আপনার ফোন ধরবে কেন।

মৌসুমি ভিসা থেকে স্থায়ীর দিকে
নতুন আইন মৌসুমি কর্মীকে একটা সত্যিকারের সুযোগ দেয়: সিজন ভালো গেলে নিয়োগকর্তা পরের বছর তাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, বা তার কন্ট্রাক্ট স্থায়ীতে বদলে দিতে পারে। এই পথের চাবি একটাই — রেকর্ড। মৌসুমি ভিসার শর্ত পূরণ করা আর সময়মতো ফিরে যাওয়া আপনার রেকর্ড পরিষ্কার রাখে, আর এই পরিষ্কার রেকর্ডই পরের বছরের কোটায় আপনার কাজে লাগে।
এর উল্টোটা — ভিসা শেষ হওয়ার পরও থেকে যাওয়া, অর্থাৎ overstay — আপনার প্রতিটি ভবিষ্যৎ আবেদনের গায়ে একটা দাগ। কয়েক মাসের লাভের জন্য মানুষ বছরের পর বছরের পথ বন্ধ করে ফেলে। এই সিদ্ধান্ত প্রায়ই হয় আবেগের বশে, আর এর দাম ঠান্ডা মাথায় বোঝা যায় অনেক পরে।
ফাইলে কী কী থাকা উচিত — এটা জিজ্ঞেস করা আপনার অধিকার
আবেদন যায় নিয়োগকর্তার তরফ থেকে, কিন্তু নামটা থাকে আপনার। তাই ফাইলে কী লাগানো আছে, তা জানা আপনার অধিকার। একটা আসল আবেদনে এই জিনিসগুলো থাকে:
- কোম্পানির আর্থিক কাগজপত্র — ট্যাক্স রিটার্ন আর DURC, অর্থাৎ সোশ্যাল সিকিউরিটি পরিশোধের ছাড়পত্র
- কর্মীর থাকার ব্যবস্থা — idoneità alloggiativa, অর্থাৎ বাসস্থান পরিদর্শনের সার্টিফিকেট
- কন্ট্রাক্টের শর্ত, যেখানে বেতন হতে হবে জাতীয় যৌথ চুক্তি (CCNL) অনুযায়ী
এর কোনোটা না থাকলে nulla osta সেখানেই আটকে যায়। কেউ যদি আপনার কাছে টাকা চাইছে, অথচ এই কাগজগুলো নিয়ে সোজা জবাব দিচ্ছে না — তাহলে আপনার জবাব আপনার হাতেই আছে।
তাহলে এই পথটা কাজে লাগাবেন কীভাবে
প্রথম কথা: এই পথ আসল, কিন্তু অনিশ্চিত। দুটো কথাই একসঙ্গে সত্যি, আর দুটোকেই একসঙ্গে মেনে নিতে হবে। এটাকে জীবনের একমাত্র পরিকল্পনা বানাবেন না। স্টাডি ভিসা, Blue Card আর অন্য দেশের পথগুলোও পাশাপাশি দেখতে থাকুন — যাতে একটা click day-র ওপর আপনার সবগুলো বছর বাজি না থাকে।
দ্বিতীয় কথা: লাখ লাখ টাকায় nulla osta কেনা একটা জুয়া, আর এই জুয়ায় বেশির ভাগ সময় হারই হয়। আর যেটা জেতা মনে হয়, সেটাও ইতালি পৌঁছে প্রতারণা বলে বেরিয়ে আসতে পারে। যে টাকায় আপনি একটা অনিশ্চিত কাগজ কিনতে যাচ্ছেন, সেই টাকায় একটা আইনি পথের দুই বছর চলে যেতে পারে।
তৃতীয় কথা: ইতালিতে থাকা আপনার আত্মীয় বা বন্ধুই আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ। আসল নিয়োগকর্তা পর্যন্ত সে-ই পৌঁছে দিতে পারে, কোম্পানির আসল অবস্থা সে-ই দেখে আসতে পারে, আর কোন নাম ভরসার যোগ্য, তা-ও সে-ই বলতে পারে। আর ফাইল তৈরির জন্য patronato অফিস আছে, যারা এই কাজ বিনামূল্যে করে। যে কাজের জন্য কেউ টাকা নেয় না, সেই কাজের টাকা দেওয়াই হলো সবচেয়ে সহজে এড়ানো যায় এমন ক্ষতি।
সর্বশেষ ঘোষণা কোথায় দেখবেন
- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় — কোটার ঘোষণা ও ইমিগ্রেশন: interno.gov.it
- ভিসা তথ্য: vistoperitalia.esteri.it
এখানে লেখা কথাগুলো ব্যবস্থাটা বোঝানোর জন্য, আইনি পরামর্শ নয়। কোটার ঘোষণা, click day-র তারিখ আর নিয়মকানুন প্রতি বছর বদলায়, আর হোয়াটসঅ্যাপে ঘুরতে থাকা পুরোনো ঘোষণাকে আজকের খবর বানিয়ে দেখানো হয়। সর্বশেষ ঘোষণা সবসময় সরকারি সূত্র থেকে দেখুন, আর নিজের ফাইল কোনো patronato অফিস বা স্বীকৃত আইনজীবীকে দিয়ে তৈরি করান।