একটা প্রশ্ন আমাদের কাছে বারবার আসে, প্রায় একই ভাষায়: “পর্তুগালে পাঁচ বছর পড়াশোনার পর পাসপোর্ট পাওয়া যায়, তাই না?”
জবাব দেওয়ার আগে দেখা দরকার প্রশ্নটা কোথা থেকে এসেছে। এই প্রশ্ন কোনো আইন থেকে আসেনি, এসেছে সেইসব ভিডিও থেকে, যেগুলো দুই-তিন বছর আগে বানানো হয়েছিল এবং আজও চলছে। আসল কথা পরে আসবে, তবে সংক্ষেপে এটুকু: নাগরিকত্ব আইনে মেয়াদ বাড়ানোর সংশোধনী প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, আর কোনো বিচক্ষণ মানুষ নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত ওই পুরোনো সংখ্যার ওপর ভরসা করে নিতে পারে না।
কিন্তু এতে পর্তুগালে পড়াশোনার মূল্য কমে না। বরং উল্টো — স্টাডি ভিসা আজও পর্তুগালে যাওয়ার সবচেয়ে মজবুত ও সবচেয়ে কম ব্যবহৃত পথগুলোর একটি। শুধু এটাকে পাসপোর্টের সিঁড়ি না ভেবে শিক্ষা ও ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখতে হবে।
পর্তুগালই কেন
প্রথম কারণ টাকা। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর ও মাস্টার্সের ফি সাধারণত বছরে ১,০০০ থেকে ৩,৫০০ ইউরোর মধ্যে থাকে, প্রোগ্রাম অনুযায়ী। যুক্তরাজ্য বা আমেরিকার তুলনায় এটা কয়েক গুণ কম। এক মুহূর্ত থেমে ভাবুন: এই অঙ্ক প্রায়ই সেই টাকার চেয়েও কম, যা মানুষ “ওয়ার্ক ভিসা করিয়ে দেওয়ার” নামে এজেন্টকে দিয়ে দেয়।
দ্বিতীয় কারণ প্রতিষ্ঠান। Universidade de Lisboa, Porto, Coimbra, NOVA, Minho ও Aveiro-র মতো নাম ইউরোপে পরিচিত। এদের পাশাপাশি আছে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট (IPs), যেগুলো ব্যবহারিক শিক্ষায় মনোযোগ দেয় এবং যেখানে ভর্তি তুলনামূলক সহজ — অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এটাই বেশি বুদ্ধিমানের পছন্দ।
তৃতীয় কারণ পরিবেশ। দেশটা নিরাপদ, আমাদের কমিউনিটি বাড়ছে, আর শুরুতে ইংরেজি দিয়ে কাজ চলে যায়। কিন্তু এই শেষ কথাটা একটা নরম ফাঁদও বটে — পর্তুগিজ শেখা শিক্ষার্থীরা দুই বছরে তাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে যায়, যারা ইংরেজির ভরসায় চলতে থাকে।
ভর্তি ও ভিসা — প্রক্রিয়ার আসল ধারা
প্রথম ধাপ ভর্তি, ভিসা নয়। আবেদন সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পোর্টালে করা হয়: ডিগ্রি, ট্রান্সক্রিপ্ট আর ইংরেজির প্রমাণ — হয় IELTS, নয়তো প্রতিষ্ঠানের নিজের নির্ধারিত মানদণ্ড। অনেক প্রতিষ্ঠান আবেদন ফি নেয়, সাধারণত ৫০ ইউরোর কাছাকাছি।
এই বাক্যটা আবার পড়ুন: পোর্টাল খোলা আছে এবং আবেদন আপনি নিজেই করতে পারেন। এই একটা বাক্যেই সেইসব “ভর্তি প্লাস ভিসা গ্যারান্টি প্যাকেজের” মুখোশ খুলে যায়, যেগুলো লাখ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। কেউ আপনাকে সাহায্য করলে তার পরিশ্রমের ন্যায্য ফি প্রাপ্য, কিন্তু যে টাকা চাওয়া হয় তা পরিশ্রমের দাম নয়, আপনার না-জানার দাম।
ভর্তির চিঠি পাওয়ার পর আসে ভিসা ফাইলের (D4) পালা, যা কনস্যুলেট বা VFS-এ জমা হয়। এতে আর্থিক প্রমাণ সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ — পুরো বছরের খরচের ব্যবস্থা দেখাতে হয়, আর মোটা হিসাবে সেটা প্রায় সাত হাজার ইউরো ধরা হয়, অথবা তার বদলে নিয়মমাফিক স্পনসরশিপ। সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা, ইনস্যুরেন্স, পুলিশ সার্টিফিকেট ও ফি।
সিদ্ধান্তে সপ্তাহও লাগতে পারে, মাসও — তাই সেশন শুরুর অনেক আগে ফাইল জমা দিন। প্রত্যাখ্যানের কারণ প্রতিবার একই বেরোয়: দুর্বল আর্থিক কাগজ, অসম্পূর্ণ ফাইল, আর পড়াশোনার ধারায় এমন ফাঁক, যার কোনো ব্যাখ্যা নেই। আপনি যদি বি.কম-এর পর কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্স বেছে নেন, সেটা সম্ভব — কিন্তু তার কারণ আপনার ফাইলে লেখা থাকতে হবে, নইলে অফিসার নিজেই নিজের মতো কারণ ধরে নেবেন।
পর্তুগালে পৌঁছে প্রথম সপ্তাহগুলোর কাজ সোজা: NIF ও NISS করান, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধন সম্পূর্ণ করুন, আর AIMA-র মাধ্যমে রেসিডেন্স পারমিটের প্রক্রিয়া শুরু করুন। এখানে দুটো কথা মনে রাখুন। প্রথমত, NIF ও NISS বিনামূল্যের — এগুলোর জন্য যে টাকা চায়, সে আপনাকে ঠকাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, AIMA-র ব্যাকলগ (জমে থাকা ফাইলের জট) বাস্তব, আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা সিদ্ধান্তে মাস লেগে যেতে পারে। এই সময়ে আপনার ভরসা সেই রসিদ ও রেফারেন্স নম্বরগুলো, যা প্রমাণ করে আপনি সময়মতো আবেদন করেছিলেন। আর যেখানে অপেক্ষা দীর্ঘ, সেখানে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বিক্রি করার লোক হাজির হয় — সরকারি চ্যানেলের বাইরে কাউকে এক ইউরোও দেবেন না।

পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের অনুমতি আছে — স্বাভাবিক সময়ে পার্ট-টাইম, ছুটিতে বেশি। রেস্টুরেন্ট, ডেলিভারি, গুদাম আর ক্যাম্পাসের চাকরি — এই পথগুলো দিয়েই বেশিরভাগ শিক্ষার্থী নিজের খরচ চালায়।
তবে প্রথম সেমিস্টার নিয়ে একটা স্পষ্ট পরামর্শ: এটা পড়াশোনা গুছিয়ে নেওয়ার কাজে লাগান। যে বিষয়গুলোতে ফেল আসে, সেগুলো শুধু পড়াশোনার ক্ষতি নয় — ভিসা নবায়নের সময় প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসে। অনেক শিক্ষার্থী প্রথম চার মাসে বেশি রোজগারের চক্করে পুরো বছরটাই ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
পড়াশোনার পরে কী
ডিগ্রি শেষ হলে চাকরি খোঁজার জন্য দেশে থাকার সুযোগ মেলে, আর চাকরি পেয়ে গেলে স্টুডেন্ট পারমিট ওয়ার্ক পারমিটে বদলে যায়। এটাই এই পথের সবচেয়ে বড় গুণ: আপনি প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত বৈধ থাকেন, কোনো পর্যায়ে আপনাকে লুকোতে হয় না।
নিজের ক্ষেত্রের চাকরিতে আপনার অবস্থান সময়ের সঙ্গে মজবুত হতে থাকে, আর পাঁচ বছর বৈধ বসবাসের পর স্থায়ী বসবাসের আবেদন সম্ভব হয়। ছাত্রজীবনের বছরগুলোও এই হিসাবে ধরা হয়, তবে সেগুলো গণনার নিজস্ব নিয়ম আছে — নিজের হিসাব আন্দাজে করবেন না, কোনো নির্ভরযোগ্য পরামর্শদাতাকে দিয়ে করান, কারণ কয়েক মাসের পার্থক্য পুরো আবেদনের সময় বদলে দেয়।
এবার সেই প্রশ্ন, যেখান থেকে কথা শুরু হয়েছিল
পুরোনো গল্পটা ছোট ছিল: পাঁচ বছর, তারপর পাসপোর্ট। বাস্তবতা এর চেয়ে সতর্ক। নাগরিকত্ব আইনে মেয়াদ বাড়ানোর সংশোধনী পার্লামেন্টে আলোচনায় থেকেছে, আর প্রস্তাবগুলোতে CPLP-বহির্ভূত দেশের মানুষদের জন্য দীর্ঘতর মেয়াদ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ফলাফল যা-ই হোক, একটা নিয়ম বদলাবে না: সিদ্ধান্ত হবে সেই আইনে, যা আপনার আবেদনের সময় বলবৎ থাকবে — সেই আইনে নয়, যা আপনার রওনা হওয়ার দিন বলবৎ ছিল। তাই পর্তুগালকে বেছে নিন পড়াশোনা, কাজ আর জীবনযাত্রার মানের ভিত্তিতে। এই তিনটা জিনিস যদি আপনার জন্য কাজ করে, তাহলে আইনের যেকোনো সংশোধনীর পরেও আপনার সিদ্ধান্ত সঠিক থাকবে। আর আপনার পুরো হিসাব যদি শুধু পাসপোর্টের গণনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে পার্লামেন্টের একটা ভোটই তা ভেঙে দিতে পারে।
তবে একটা জিনিস সব অবস্থাতেই লাগবে: A2 স্তরের পর্তুগিজ ভাষার সার্টিফিকেট। এই কাজটা প্রথম বছর থেকেই শুরু করে দেওয়া উচিত, কারণ শেষ বছরে এটা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

খরচের আনুমানিক হিসাব
নিচের সব সংখ্যা আনুমানিক এবং শহর, প্রতিষ্ঠান ও বছরভেদে বদলায় — এগুলোকে চূড়ান্ত হিসাব নয়, প্রাথমিক নকশা হিসেবে ধরুন।
| বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি | বছরে প্রায় ১,০০০–৩,৫০০ ইউরো (অনেক প্রতিষ্ঠানে স্কলারশিপ ও কিস্তির ব্যবস্থা আছে) |
| রুম: Lisboa বা Porto | মাসে প্রায় ৩৫০–৬০০ ইউরো |
| রুম: Braga, Covilhã, Évora | মাসে প্রায় ২০০–৩৫০ ইউরো |
| খাবার ও যাতায়াত | মাসে প্রায় ১৫০–২৫০ ইউরো (শিক্ষার্থীদের mensa [ছাত্র ক্যান্টিন] আর ট্রান্সপোর্ট পাস বেশ সস্তা) |
এই তালিকা থেকে একটা সিদ্ধান্ত নিজেই বেরিয়ে আসে: ছোট শহরে পড়া একজন শিক্ষার্থী শুধু রুমের খাতেই বছরে এতটা সাশ্রয় করে, যা প্রায়ই পুরো ফির সমান দাঁড়ায়।
তিনটি জিনিস থেকে সাবধান থাকুন
- “ভর্তি + ভিসা গ্যারান্টি” প্যাকেজ। ভিসার সিদ্ধান্ত নেয় কনস্যুলেট, বিক্রেতা নয় — আর যে আবেদনের গ্যারান্টি বিক্রি করা হচ্ছে, সেই আবেদন আপনি নিজেই করতে পারেন।
- অখ্যাত “কলেজ”, যাদের আসল ব্যবসা ভর্তি নয়, ভিসা। এমন প্রতিষ্ঠানের কাগজে ফাইল বাতিল হয়, টাকাও ডোবে। ভর্তি নেওয়ার আগে যাচাই করে নিন প্রতিষ্ঠানটি DGES-এর তালিকায় আছে কি না।
- সেই “প্ল্যান”, যেখানে ভর্তি নিয়ে গায়েব হয়ে যেতে হয়। উপস্থিতি আর ফলাফল না থাকলে পারমিট চলে না, আর ২০২৪ সালে “পৌঁছে গিয়ে রেগুলারাইজ করার” পুরোনো পথ বন্ধ হওয়ার পর এর সামনে আর কিছু নেই। এটা বন্ধ গলি, শর্টকাট নয়।
সরকারি লিংক
- স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা: dges.gov.pt
- ভিসার ফর্ম ও শর্তাবলি: vistos.mne.gov.pt
- রেসিডেন্স পারমিট ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট: aima.gov.pt
এই লেখাটি তথ্যের জন্য, আইনি বা শিক্ষাবিষয়ক পরামর্শ নয়। ফি, আর্থিক সীমা এবং বিশেষ করে নাগরিকত্ব আইন বদলাতে পারে, আর এখানে দেওয়া সংখ্যাগুলো শুধু আনুমানিক। কোনো প্রতিষ্ঠানকে ফি পাঠানোর বা ফাইল জমা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও নিজের কনস্যুলেটের হালনাগাদ তথ্য নিজে দেখে নিন।