কয়েক বছর আগেও পর্তুগাল নিয়ে একটা কথা সব জায়গায় শোনা যেত: “যেভাবে হোক পৌঁছে যাও, কাগজ ওখানেই হয়ে যায়।” আর অবাক করা ব্যাপার হলো, কথাটা তখন ভুলও ছিল না। পর্তুগাল সত্যিই ছিল ইউরোপের সবচেয়ে নরম দরজা।
কিন্তু সেই যুগ শেষ হয়ে গেছে। ২০২৪ সালের জুনে আইন বদলে গেল, আর যে পথের ওপর এই পুরো গল্পটা দাঁড়িয়ে ছিল — manifestação de interesse — সেটা বন্ধ করে দেওয়া হলো। সমস্যা হলো, বন্ধ হওয়ার খবরটা ছড়ায়নি, ছড়িয়েছিল শুধু খোলা থাকার খবর। ইউটিউবে আজও সেই পুরোনো ভিডিওগুলোই চলছে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সেই পুরোনো কথাগুলোই ঘুরছে, আর এজেন্টরা সেই পুরোনো মালই বেচছে — এমন একটা দরজা, যেটা তাদের নিজেদের জানামতেও বন্ধ হয়ে গেছে।
তাহলে চলুন আজকের পর্তুগালের সোজাসাপ্টা ছবিটা দেখি। কী বন্ধ হয়েছে, কী খোলা আছে, আর কোথায় মানুষ সবচেয়ে বেশি টাকা আর সময় নষ্ট করছে।
আগে বুঝুন, বন্ধ হয়েছে কী
Manifestação de interesse-র মানে ছিল সহজ: আপনি যেকোনোভাবে পর্তুগালে পৌঁছে যান — ট্যুরিস্ট ভিসায়, অন্য কোনো অজুহাতে — তারপর সেখানে কিছুদিন কাজ করে সোশ্যাল সিকিউরিটিতে চাঁদা দিন, আর সেই ভিত্তিতেই দেশের ভেতরে থেকে বসবাসের আবেদন করে দিন। না ভিসার দরকার, না আগে থেকে জব অফারের।
২০২৪ সালে সরকার এই দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। এখন নিয়মটা এক বাক্যে: পর্তুগালে কাজ করতে হলে কাজের ভিসা নিয়েই আসতে হবে। পৌঁছে গিয়ে কাগজ বানানোর ব্যবস্থা এখন আর নেই।
এই একটা কথা বুঝে নিলে অর্ধেক ধোঁকা এমনিতেই বোঝা হয়ে যাবে। যে মানুষ আজ আপনাকে বলে “পৌঁছে যাও, বাকিটা আমরা দেখে নেব” — সে হয় নিজেই জানে না, নয়তো জেনেশুনে আপনাকে ২০২৩ সালের পর্তুগালে পাঠাচ্ছে, যেটার এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই।
জব সিকার ভিসা — যে পথ পর্তুগালকে বিশেষ করে তোলে
ইউরোপের খুব কম দেশই এমন ভিসা দেয়, যা শুধু চাকরি খোঁজার জন্য। পর্তুগাল দেয়। এতে আপনি ১২০ দিন পর্তুগালে থেকে কাজ খুঁজতে পারেন, আর দরকার হলে আরও ৬০ দিনের মেয়াদ বাড়ানো যায় — অর্থাৎ মোট প্রায় ছয় মাস। চাকরি পেয়ে গেলে ফিরে এসে নতুন ভিসা লাগানোর দরকার নেই; সেখান থেকেই বসবাসের অনুমতির দিকে প্রক্রিয়া এগোয়।
আবেদন করতে হয় নিজের দেশে পর্তুগিজ কনস্যুলেট বা তার ভিসা সেন্টারে। দেখাতে হয় কী: থাকার খরচের প্রমাণ, থাকার ব্যবস্থা, ইনস্যুরেন্স, পরিষ্কার পুলিশ রেকর্ড আর ফেরার যুক্তিসংগত ব্যবস্থা। সত্যি বলতে, স্লট সীমিত আর চাহিদা প্রচুর — এখানে শুধু সম্পূর্ণ আর সত্যি ফাইলই আপনার সুযোগ তৈরি করে। এই ভিসা নিয়ে আমরা আলাদা একটা পূর্ণাঙ্গ লেখা লিখেছি; আবেদন থেকে শুরু করে পর্তুগালে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ তাতে খোলাসা করা আছে।

ওয়ার্ক ভিসা — যখন অফার আগে থেকেই আছে
কোনো পর্তুগিজ কোম্পানি যদি আপনাকে নিয়ম মেনে কন্ট্রাক্ট দিয়ে থাকে, তাহলে ওয়ার্ক ভিসার আবেদন হয়। কৃষি, নির্মাণ, পর্যটন আর কারখানায় হাতের কাজ করা মানুষের চাহিদা আসল — এটা কোনো গল্পকথা নয়।
কিন্তু কন্ট্রাক্ট হাতে পেয়েই খুশি হওয়ার আগে একটা কাজ অবশ্যই করুন: কোম্পানিটা নিজে যাচাই করুন। তার নাম, তার NIF নম্বর, আর সে সত্যিই আছে কি না আর কাজ করছে কি না। শুধু কাগজে বানানো কোম্পানির কন্ট্রাক্টও বিক্রি হয়, আর যেদিন দূতাবাস যাচাই করে, সেদিনই পুরো ব্যাপারটা ফাঁস হয়ে যায়।
স্টুডেন্ট ভিসা
বিশ্ববিদ্যালয় বা পলিটেকনিকে ভর্তি হলে স্টুডেন্ট ভিসা মেলে। পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় ফি লক্ষণীয়ভাবে কম, শিক্ষার্থীরা সীমিত ঘণ্টা কাজ করতে পারে, আর পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর বসবাসের দিকে পরিষ্কার পথ আছে। যাদের শিক্ষাগত রেকর্ড আছে, তাদের জন্য এটা প্রায়ই সবচেয়ে মজবুত অথচ সবচেয়ে কম ব্যবহৃত দরজা। এ নিয়েও আমাদের আলাদা বিস্তারিত লেখা আছে।
বাকি পথগুলো — কার জন্য কোনটা
এই চারটির বাইরেও কয়েকটা দরজা আছে, আর প্রতিটি একটা বিশেষ ধরনের মানুষের জন্য বানানো। D7 তাদের জন্য, যাদের স্থায়ী আয় আগে থেকেই আছে — পেনশন, ভাড়ার আয়, বা বিনিয়োগের মুনাফা। ডিজিটাল নোমাড ভিসা তাদের জন্য, যারা কোনো বিদেশি কোম্পানির হয়ে অনলাইনে কাজ করে আর একটা নির্দিষ্ট মাসিক আয় দেখাতে পারে; আমাদের অনেক ফ্রিল্যান্সার তরুণ জানেই না যে তাদের হাতে ইউরোপের একটা খোলা আর বৈধ দরজা আছে। D2 তাদের জন্য, যারা নিজের ব্যবসা শুরু করতে চায় এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা আর পুঁজি — দুটোই রাখে। আর ফ্যামিলি রিইউনিয়ন তাদের জন্য, যাদের কোনো নিকটাত্মীয় আগে থেকেই পর্তুগালে বৈধভাবে বসবাস করছে।

AIMA আর অপেক্ষার সত্যিটা
পুরোনো ইমিগ্রেশন সংস্থা SEF তুলে দিয়ে নতুন সংস্থা AIMA বানানো হয়েছে। উদ্দেশ্য ভালো ছিল, ফল হলো এই যে লাখ লাখ ঝুলে থাকা আবেদন নতুন সংস্থার ঘাড়ে এসে পড়ল। আজ অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে আর সিদ্ধান্ত আসতে মাসের পর মাস লাগে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বছরও।
এই কথাটা আগে থেকে জেনে পরিকল্পনা করুন, কারণ এই ধীরগতির ওপরেই একটা গোটা ব্যবসা দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ “সেটিং” আর “পাকা অ্যাপয়েন্টমেন্ট”-এর নামে টাকা নেয়। সোজা কথা এটাই: AIMA-র অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য টাকা চাওয়া প্রত্যেক মানুষই ধোঁকা দিচ্ছে। অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা সবার জন্য একটাই, আর এতে কারও হাতে কোনো গোপন দরজা নেই।
নাগরিকত্বের প্রশ্ন — আর এখানে সাবধান থাকুন
পর্তুগালের খ্যাতির একটা বড় কারণ এই ছিল যে বৈধ বসবাসের পাঁচ বছর পর নাগরিকত্বের আবেদন করা যেত। মানুষ গোটা জীবনের পরিকল্পনা এই এক বাক্যের ওপরেই সাজিয়েছে।
কিন্তু এখন পরিষ্কার কথা হলো, সরকার নাগরিকত্ব আইন কঠোর করার প্রস্তাব দিয়েছে, যার মধ্যে মেয়াদ বাড়ানোও আছে, আর এই বিতর্ক এখনো চলছে। নিয়ম একটাই, সেটা মনে রাখুন: সিদ্ধান্ত হবে সেই আইনে, যা আপনার আবেদনের সময় বলবৎ থাকবে — সেই আইনে নয়, যা আজ ইউটিউবের ভিডিওতে বলা হচ্ছে। আপনার পুরো সিদ্ধান্ত যদি শুধু পাসপোর্টের হিসাবের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত দুর্বল ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
পর্তুগালে জীবন — পৌঁছানোর আগেই হিসাব কষে নিন
পর্তুগালের ন্যূনতম বেতন পশ্চিম ইউরোপের একেবারে নিচের সারিতে — মাসে প্রায় ৮০০ ইউরোর কিছু ওপরে, যা বছরে চৌদ্দ কিস্তিতে মেলে আর প্রতি বছর কিছুটা বাড়ে। তার তুলনায় লিসবন আর পোর্তোর বাড়িভাড়া বেড়েছে অনেক দ্রুত। অর্থাৎ বড় শহরে ন্যূনতম বেতনে চলা ততটা সহজ নয়, যতটা দূর থেকে মনে হয়। হিসাবটা পৌঁছানোর আগেই করুন, পরে নয়।
কাজের বড় খাতগুলো সেগুলোই: Alentejo আর Odemira-র খামার, নির্মাণ, পর্যটন আর রেস্তোরাঁ, আর গুদাম। পাকিস্তানি, ভারতীয় আর বাংলাদেশি কমিউনিটি বড়, সাহায্যও মেলে — কিন্তু এখানে একটা অপ্রিয় সত্যিও আছে: কন্ট্রাক্ট আর ভাড়ার অনেক ধোঁকা আসে কমিউনিটির ভেতর থেকেই। নিজের লোকের কথায় না পড়েই সই করে দেওয়াটাই সবচেয়ে চড়া দামের অভ্যাস।
আর শেষ একটা কথা, যা প্রত্যেক নবাগতের জানা উচিত: ট্যাক্স নম্বর (NIF) আর সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর (NISS) ওখানকার জীবনের ভিত্তি, আর এ দুটোই বিনা খরচে বা সামান্য ফিতে নিজে নিজেই বানানো যায়। এগুলোর “রেট” বসানো লোকজন আছে আর কাজও চালিয়ে যাচ্ছে। যে জিনিস বিনা খরচে মেলে তার জন্য টাকা দেওয়াই সবচেয়ে সহজে এড়ানো যায় এমন ক্ষতি। দৈনন্দিন জীবন, ভাড়া, বেতন আর অধিকার নিয়ে আমাদের আলাদা ব্যবহারিক গাইড আছে।
সরকারি ওয়েবসাইট — যাচাই এখান থেকেই করুন
- ইমিগ্রেশন সংস্থা: aima.gov.pt
- ভিসার তথ্য ও ফর্ম: vistos.mne.gov.pt
এখানে লেখা প্রতিটি কথা সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য — এটা আইনি পরামর্শ নয়, আর একে উকিলের বিকল্পও ভাববেন না। পর্তুগালের ইমিগ্রেশন আইন এই মুহূর্তে যে গতিতে বদলাচ্ছে, তাতে কয়েক মাসের পুরোনো তথ্যও বিভ্রান্ত করতে পারে। কোনো পদক্ষেপ নেওয়া, টাকা ঢালা বা টিকিট কাটার আগে ওপরে দেওয়া সরকারি সূত্রগুলো থেকে আজকের অবস্থা নিজে দেখে নিন।