ফেসবুক গ্রুপগুলোতে একটি কথা আজও প্রতি সপ্তাহে ঘোরে: ‘পর্তুগাল তো খোলা, যেভাবে হোক পৌঁছে যাও, কাগজ ওখানেই হয়ে যায়।’ এই কথাটি এক সময় অর্ধেক সত্যি ছিল। এখন এটি পুরোপুরি মিথ্যা।
পর্তুগালে বছরের পর বছর এমন এক ব্যবস্থা চালু ছিল, যাতে ভিসা ছাড়া পৌঁছানো মানুষও কাজ আর সোশ্যাল সিকিউরিটির পেমেন্ট দেখিয়ে সময়ের সঙ্গে নিজের কাগজ করিয়ে নিতে পারত। ২০২৪ সালে সেই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যে এজেন্ট আজও আপনাকে ‘পৌঁছে রেগুলারাইজ’ হওয়ার স্বপ্ন বেচছে, সে এমন এক জিনিসের টাকা নিচ্ছে, যার এখন অস্তিত্বই নেই। এই কথাটি মাথায় রেখে সামনে পড়ুন, কারণ বাকি পুরো আলোচনা এই একটি পরিবর্তনকে ঘিরেই ঘোরে।
আর এখান থেকেই জব সিকার ভিসা-র গুরুত্ব শুরু হয়। এটি ইউরোপের সেই অল্প কয়েকটি দরজার একটি, যা আগে থেকে চাকরি ছাড়াও বৈধভাবে খোলে। আপনি ভিসা নিয়ে পর্তুগালে পৌঁছান, সেখানে থেকে চাকরি খোঁজেন, আর চাকরি পেলে দেশের ভেতরে থেকেই বসবাসের অনুমতির দিকে এগোন — ফিরে গিয়ে নতুন করে ভিসা লাগানোর দরকার পড়ে না।
এই ভিসা আসলে আপনাকে কী দেয়
এটি ট্যুরিস্ট ভিসা নয়, কোনো স্থায়ী অনুমতিও নয়। এটি একটি বিশেষ উদ্দেশ্যের জাতীয় ভিসা, যার লক্ষ্য একটিই: চাকরির খোঁজ। এতে আপনি পান ১২০ দিন, যা আরও ৬০ দিন বাড়ানো যায়। অর্থাৎ সব মিলিয়ে প্রায় ছয় মাস।
ছয় মাস শুনতে দীর্ঘ সময় মনে হয়। বাস্তবে তা দীর্ঘ হয় না। এর প্রথম দুই-তিন সপ্তাহ তো কাগজপত্রের কাজেই চলে যায় — নম্বর করানো, থাকার ব্যবস্থা পাকা করা, ব্যাংক। তাই সবার আগে যে কথাটি বুঝে নেওয়া দরকার, তা হলো: এই ভিসা বিশ্রামের সময় দেয় না, কাজ খোঁজার সময় দেয়।
আবেদনে কী কী লাগে
আবেদন জমা হয় নিজের দেশে পর্তুগিজ কনস্যুলেট বা তার ভিসা সেন্টারে (VFS)। ফর্মটি জাতীয় ভিসার, আর ফি প্রায় ৯০ ইউরোর কাছাকাছি হয়। ফি ও শর্ত দুটোই সময়ের সঙ্গে বদলায়, তাই তালিকাটি সব সময় কনস্যুলেটের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে মিলিয়ে নিন।
ফাইলের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ আর্থিক সামর্থ্য। আপনাকে দেখাতে হয় যে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত আপনি নিজের খরচ নিজে চালাতে পারবেন। মাপকাঠি পর্তুগালের ন্যূনতম বেতনের সঙ্গে যুক্ত; মোটা হিসাবে ধরুন, প্রায় তিন মাসের ন্যূনতম বেতনের সমান বা তার বেশি টাকা আপনার নিজের নামের অ্যাকাউন্টে থাকতে হবে, আর তার উৎস হতে হবে বৈধ ও ব্যাখ্যাযোগ্য। স্পনসর থাকলে তার কাগজপত্র সঙ্গে দিতে হয়।
এখানে একটি কথা সাফ বলে দিই। পরিচিত কারও কাছ থেকে কয়েক দিনের জন্য টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকিয়ে স্টেটমেন্ট বের করা সেই চাল, যা কনস্যুলেটের কর্মীরা রোজ দেখেন। হঠাৎ আসা বড় অঙ্ক ফাইলকে মজবুত করে না, সন্দেহজনক করে।
বাকি কাগজপত্র তুলনামূলক সোজা, আর এটিই সেই তালিকা, যা সত্যিই একটি তালিকা:
- ফেরার টিকিট বা বুকিংয়ের প্রমাণ — ভিসার যুক্তিটাই এই যে চাকরি না পেলে আপনি ফিরে যাবেন।
- পর্তুগালে থাকার ব্যবস্থা: হোটেল বা ঘরের বুকিং, অথবা কোনো আত্মীয়ের আমন্ত্রণপত্র।
- সত্যায়িত পুলিশ ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট।
- ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স।
- সিভি এবং এই ব্যাখ্যা যে আপনি কোন খাতে কাজ খুঁজবেন।
শেষ পয়েন্টটিকে আনুষ্ঠানিকতা ভাববেন না। যে ফাইলে সিভি, অভিজ্ঞতা আর উদ্দেশ্য একে অপরের সঙ্গে মেলে, সেটি ওই ফাইলের চেয়ে অনেক মজবুত, যেখানে একজন বিএ পাস তরুণ লিখে দেয় যে সে ওয়েল্ডিং করতে যাচ্ছে। বাস্তববাদিতা নিজেই একটি দলিল।

মাটির বাস্তবতা, যা কোনো এজেন্ট বলে না
স্লট সীমিত, আবেদন অনেক বেশি, আর অপেক্ষা দীর্ঘ। প্রত্যাখ্যানও হয়, আর তার কারণগুলো প্রতিবার একই বেরোয়: দুর্বল বা সন্দেহজনক আর্থিক কাগজ, অসংলগ্ন ফাইল, আর জাল দলিল।
এই ভিড়ই একটি গোটা ব্যবসার জন্ম দিয়েছে। কেউ যদি আপনাকে বলে তার কাছে ‘পাকা স্লট’ আছে বা সে ‘গ্যারান্টি’ দিচ্ছে, তবে সেটি মিথ্যা — অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা সবার জন্য একটিই, আর তাতে কারও ব্যক্তিগত কোটা নেই। গ্যারান্টি কেবল সেই জিনিসেরই দেওয়া যায়, যা বিক্রেতার হাতে থাকে; আর ভিসার সিদ্ধান্ত কোনো এজেন্টের হাতে নেই।
পর্তুগালে পৌঁছে প্রথম সপ্তাহগুলো
পৌঁছেই সবার প্রথম কাজ NIF অর্থাৎ ট্যাক্স নম্বর, যা Finanças-এর দপ্তর থেকে হয়। তারপর NISS অর্থাৎ সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর, যা Segurança Social থেকে মেলে এবং যা ছাড়া বৈধ কাজ সম্ভব নয়। এই দুটি নম্বর সম্পর্কে একটি কথা সব সময় মনে রাখুন: এগুলো বিনামূল্যের, বড়জোর সামান্য ফি। যারা এগুলোর জন্য একশো-দুশো ইউরো চায়, তারা কোনো সেবা বেচছে না, আপনার না-জানাটা বেচছে।
তৃতীয় কাজ IEFP অর্থাৎ সরকারি কর্মসংস্থান সংস্থায় রেজিস্ট্রেশন। জব সিকার হিসেবে এই নিবন্ধন শুধু উপকারীই নয়, কোনো কোনো ধাপে আপনার কাছ থেকে এটি প্রত্যাশাও করা হয়।
এরপর আসল কাজ শুরু হয়। চাকরি মেলে net-empregos.com, indeed.pt আর OLX-এর মতো ওয়েবসাইটে, Randstad আর Adecco-র মতো এজেন্সির মাধ্যমে, আর কমিউনিটির যোগাযোগে — আর সত্যি এটিই যে নতুন আসা মানুষদের সবার আগে কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতই নেয়: কৃষি (Odemira আর Alentejo-র খামার), নির্মাণ, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, গুদাম আর কারখানা।
চাকরি পেয়ে গেলেন — এবার কী
কনট্র্যাক্ট সই হতেই বসবাসের অনুমতির আবেদনের ধাপ আসে, যা চলে AIMA-র মাধ্যমে। যা যা লাগে, সেগুলো একই: কনট্র্যাক্ট, NIF ও NISS, সোশ্যাল সিকিউরিটিতে নিবন্ধন, থাকার প্রমাণ আর পরিষ্কার রেকর্ড।
কিন্তু এখানে এমন এক বাস্তবতা আছে, যার জন্য মানুষ মানসিকভাবে তৈরি থাকে না। AIMA-র ব্যাকলগ বিশাল। অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া আর সিদ্ধান্ত আসতে মাসের পর মাস লাগতে পারে। এই পুরো সময়ে আপনার ভরসা কেবল সেই প্রমাণ আর রসিদগুলো, যা দেখায় যে আপনি সময়মতো আবেদন করেছিলেন। প্রতিটি রসিদ, প্রতিটি ইমেইল, প্রতিটি রেফারেন্স নম্বর গুছিয়ে রাখুন।
আর যেখানে অপেক্ষা দীর্ঘ, সেখানে বিক্রেতা আপনা-আপনি জন্মে যায়। AIMA-র অ্যাপয়েন্টমেন্ট বিক্রি করার লোক আছে, আর বিক্রি করছে চড়া দামে। সরকারি চ্যানেলের বাইরে কাউকে এর টাকা দেবেন না।

যদি ছয় মাসে চাকরি না মেলে
আইনি উত্তর সোজা এবং তেতো: ফিরে যেতে হয়। আর যে মানুষ পরিষ্কার রেকর্ড নিয়ে ফিরে যায়, সে আবার আবেদন করতে পারে। যে থেকে যায়, সে নিজের শেনজেন রেকর্ড নষ্ট করে ফেলে — আর তারপর ইউরোপের যেকোনো দরজা খোলানো আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে যায়।
এখানেই সেই পুরোনো কথাটি আবার মনে করে নিন, যা দিয়ে এই লেখা শুরু হয়েছিল। থেকে যাওয়ার লাভ তখন ছিল, যখন থেকে-যাওয়া মানুষের সামনে কোনো পথ খুলত। ২০২৪-এর পরে সেই পথ নেই। এখন থেকে যাওয়া কেবলই ক্ষতি, কোনো কৌশল নয়।
তাই প্রথম দিন থেকে সিরিয়াস থাকুন: পৌঁছেই খোঁজ শুরু করুন, প্রতিটি ইন্টারভিউ আর প্রতিটি আবেদনের রেকর্ড রাখুন, আর বড় শহর আঁকড়ে থাকার বদলে আগে সেই ছোট শহর আর অঞ্চলগুলো দেখুন, যেখানে হাতের কাজ করা মানুষের প্রকৃত ঘাটতি আছে।
তিনটি কথা, যা আপনার সময় বাঁচাবে
প্রথমত, লিসবন আর পোর্তো আপনার বিপক্ষে। এই দুই শহরে ভাড়া এত চড়া যে নতুন আসা মানুষের সব পুঁজি ঘরেই চলে যায়। ছোট শহরে সেই একই টাকা অনেক বেশি মাস চলে, আর প্রায়ই কাজও সেখানেই মেলে।
দ্বিতীয়ত, পর্তুগিজ শেখা আজই শুরু করে দিন। ইন্টারভিউতে ‘bom dia’ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয়, আর সামনে নাগরিকত্বের ধাপে A2-র সার্টিফিকেট এমনিতেই চাওয়া হয়। যে কাজ দুই বছর পর বাধ্য হয়ে করতেই হবে, তা আজ আগ্রহ নিয়ে করে ফেলুন।
তৃতীয়ত, প্রতিটি কনট্র্যাক্ট পড়ে সই করুন, আর তারপর recibos অর্থাৎ বেতনের রসিদ আর সোশ্যাল সিকিউরিটির পেমেন্ট নিয়মিত চেক করতে থাকুন। এই কাগজগুলোই আপনার বসবাসের অনুমতি নবায়নের ভিত্তি, আর পরে পরিবার আনারও। ক্যাশে করা কাজ আপনার পেটের জন্য কিছু করলেও, আপনার ফাইলের জন্য কিছুই করে না।
সরকারি ওয়েবসাইট — যাচাই এখান থেকেই
- ভিসার তথ্য ও ফর্ম: vistos.mne.gov.pt
- ইমিগ্রেশন সংস্থা: aima.gov.pt
- সরকারি কর্মসংস্থান সংস্থা: iefp.pt
এই লেখাটি আপনাকে পথ বোঝানোর জন্য, আইনি পরামর্শ নয়। এতে দেওয়া সব সংখ্যা আনুমানিক — ফি, আর্থিক সীমা আর শর্ত বদলাতে থাকে, আর প্রায়ই নিঃশব্দে বদলায়। ফাইল তৈরি করার আগে সর্বশেষ তালিকা ওপরে দেওয়া সরকারি ওয়েবসাইট বা নিজের কনস্যুলেট থেকে অবশ্যই মিলিয়ে নিন।