যুক্তরাজ্যের এমন একটা ভিসাও আছে, যার জন্য না ডিগ্রি লাগে, না IELTS, না লাখ লাখ টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স। ছয় মাসের জন্য খেত আর বাগানের কাজ, বৈধ মজুরি, আর ফেরা। এটা Seasonal Worker ভিসা।
আর এই কারণেই উপমহাদেশে সবচেয়ে বেশি হইচই আর সবচেয়ে বেশি প্রতারণা এই ভিসাটাকে ঘিরেই। যেখানে শর্ত সবচেয়ে কম, সেখানে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি — আর যেখানে প্রার্থী বেশি, সেখানে বিক্রেতারা পৌঁছে যায়।
এই লেখায় সবার আগে সেই কথাটা, যা বাকি সবকিছুর চেয়ে জরুরি, আর যা পড়ে বহু মানুষ নিজের জমানো টাকা বাঁচাতে পারেন: এই ভিসার আসল পথ প্রার্থীর জন্য প্রায় বিনামূল্যে। এবার পুরো ব্যবস্থাটা দেখা যাক।
এই ভিসা আসলে কী দেয়
এটা উদ্যানপালনের কাজের জন্য — ফল, সবজি আর ফুল তোলা ও প্যাক করা — আর এতে ছয় মাস পর্যন্ত কাজের অনুমতি মেলে। পোলট্রির একটা আলাদা ও সংক্ষিপ্ত মৌসুমও এই একই ব্যবস্থার অধীনে চলে।
কিন্তু এর সঙ্গে যা মেলে না, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এটা একটা অস্থায়ী ভিসা। এটা স্থায়ী বসবাসের দিকে যায় না। এতে পরিবার সঙ্গে আসতে পারে না। এর মেয়াদ বাড়ানোর বা অন্য কোনো ভিসায় বদলানোর সাধারণ কোনো পথ নেই। ছয় মাস পরে ফেরা বাধ্যতামূলক, আর এই শর্ত নরম নয়।
প্রতি বছর সরকার এই স্কিমের জন্য কোটা নির্ধারণ করে — হাজার হাজার ভিসার — যা অনুমোদিত অপারেটরদের মধ্যে ভাগ হয়। কোটা প্রতি বছর বদলায়, তাই কেউ “এ বছর অনেক বেশি ভিসা আসছে” বললেই টাকা বের করবেন না; এই কথাটা প্রতি বছরই বলা হয়।
একমাত্র আসল পথ: লাইসেন্সধারী scheme operator
এখানে স্পনসর কোনো খামার নয়। স্পনসর হলো সরকারের অনুমোদিত scheme operators — কয়েকটা নির্দিষ্ট কোম্পানি, যারা কর্মী নিয়োগ করে এবং তাদের খামারে পাঠায়। এদের বর্তমান তালিকা gov.uk-এ Seasonal Worker visa-র পাতায় আছে, আর প্রতিটি অপারেটরের নিজস্ব নিয়োগের ওয়েবসাইট আছে।
প্রক্রিয়াটা চার ধাপের:
- অপারেটরের ওয়েবসাইটে বিনামূল্যে রেজিস্ট্রেশন। আবেদন মৌসুমের আগে খোলে।
- ইন্টারভিউ আর যাচাই অপারেটর নিজেই করে — খেতের কাজের সামর্থ্য আর মৌলিক ইংরেজি দেখা হয়।
- নির্বাচিত হলে CoS মেলে, আর তারপর আপনি ভিসা ফি দিয়ে আবেদন করেন। ফি মোটামুটি £300-এর কাছাকাছি থেকেছে।
- এই ভিসায় IHS লাগে না, আর NHS-এর জরুরি সুবিধা পাওয়া যায়।
এবার তালিকাটা আবার দেখুন আর গুনুন, এতে কোথায় কোথায় টাকা লাগল। মাত্র এক জায়গায় — ভিসা ফি। রেজিস্ট্রেশন বিনামূল্যে, ইন্টারভিউ বিনামূল্যে, নিয়োগ বিনামূল্যে। ভিসা ফি আর প্লেনের টিকিট ছাড়া আপনার কাছে যে টাকাই চাওয়া হোক, সেটাই প্রতারণার চিহ্ন। কোনো ব্যতিক্রম নেই, কোনো “প্রসেসিং” নেই, কোনো “সুপারিশ” নেই।

প্রতারণার বাজার — এই অংশটা বাড়ির সবাইকে পড়ান
পাকিস্তান আর ভারতে “যুক্তরাজ্যের ছয় মাসের ওয়ার্ক ভিসা — বারো থেকে বিশ লাখ” প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। কেউ কেউ এটাকে প্রতারণা বলে মনেই করে না, কারণ ভিসাটা আসল, স্কিমটা আসল, আর যারা যাচ্ছে তারাও আসল। শুধু একটা কথা লুকানো হয়।
কথাটা এই: অপারেটরদের আইনত অনুমতিই নেই যে তারা প্রার্থীর কাছ থেকে নিয়োগের টাকা নেবে। এটা তাদের লাইসেন্সের শর্ত। কাজেই যে মানুষটা আপনার কাছে লাখ লাখ টাকা চাইছে, সে এমন একটা জিনিস বিক্রি করছে যার দাম শূন্য। আর যেহেতু তার কাছে বিক্রি করার মতো কিছু নেই, তাই শেষে তিনটার মধ্যে একটা ঘটে: হয় সে জাল কাগজ ধরিয়ে দেয়, নয় অন্য কারও নামের আবেদন দেখিয়ে দেয়, নয়তো কিছুদিন পরে ফোন বন্ধ করে দেয়।
তিনটা লক্ষণ প্রায় প্রতিটা ভুয়া প্রস্তাবে পাওয়া যায়: হোয়াটসঅ্যাপে জাল “job offer letter” আসা; ফি “যুক্তরাজ্যের অ্যাকাউন্টে” চাওয়া; আর বলা যে “আপনার ইন্টারভিউ হবে না, আমাদের ভিতরে যোগাযোগ আছে”। আসল অপারেটর ইন্টারভিউ না করে কাউকে নেয় না, কারণ তার সত্যিই এমন কর্মী দরকার যে খেতে কাজ করতে পারবে।
আরেকটা পরিস্থিতিও ঘটে, আর তার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। কিছু ক্ষেত্রে মানুষ আসল ভিসাতেই পৌঁছেছে, কিন্তু গিয়ে দেখা গেছে, যে খামারের প্রতিশ্রুতি ছিল সেখানে কাজই নেই। এমন অবস্থায় অপারেটর বদলানোর আর অভিযোগ জানানোর পথ আছে — কিন্তু সেগুলো পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে আপনার কাছে নম্বর থাকতে হবে। তাই যুক্তরাজ্যে পৌঁছেই নিজের অপারেটরের হেল্পলাইন নম্বর লিখে, আর বাড়ির কাউকেও পাঠিয়ে, রেখে দিন।
আয়ের বাস্তবতা — সৎ হিসাব
এবার আসল প্রশ্ন, যার জন্য মানুষ এসব পড়ে। থাকে কত?
মজুরি অন্তত আইনি ন্যূনতম হারে ঘণ্টাপ্রতি মেলে, আর অপারেটরের উপর বাধ্যবাধকতা আছে যে সে সপ্তাহে অন্তত বত্রিশ ঘণ্টা কাজ দেবে। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা — মৌসুম মন্থর হলেও ঘণ্টার একটা নিচের সীমা থেকে যায়।
মোটা হিসাবটা হলো, ছয় মাসে একজন পরিশ্রমী কর্মী খরচ বাদ দিয়ে কয়েক হাজার পাউন্ড বাঁচিয়ে ফেলে। খরচের মধ্যে থাকা আছে — সাধারণত ক্যারাভান, যার ভাড়া বেতন থেকে কাটা হয় — আর তার সঙ্গে খাওয়া ও টিকিট। এটা একটা ভালো আয়, আর অনেক পরিবারের জন্য সারা বছরের ভরসা।
কিন্তু “ছয় মাসে লাখ লাখ” জাতীয় গল্পগুলো অতিরঞ্জন। আর এক মুহূর্তের জন্য হিসাব করে দেখুন: ধরুন কেউ এজেন্টকে পনেরো লাখ দিয়ে এই ভিসা নিল। ছয় মাসের সঞ্চয় সেই টাকার চেয়ে কম। অর্থাৎ সেই মানুষটা পুরো পরিশ্রম করে, ছয় মাস বিদেশে কাটিয়ে, লোকসান নিয়ে বাড়ি ফিরবে — তাও এমন একটা পথে, যা আসলে বিনামূল্যে ছিল। এই কারণেই এই ভিসায় এজেন্টকে টাকা দেওয়া শুধু বোকামি নয়, হিসাবের দিক থেকেও একটা ব্যর্থ সওদা।
কাজের ধরন নিয়েও একটা কথা। এটা কঠিন শারীরিক পরিশ্রম — কোমর ঝুঁকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তোলা, সব আবহাওয়ায়, বৃষ্টি আর ঠান্ডাতেও। যে মানুষ সত্যিই খেতের কাজে অভ্যস্ত, তার জন্য এটা ঠিক আছে। অফিসে বসা মানুষের জন্য প্রথম সপ্তাহটাই চূড়ান্ত হয়ে দাঁড়ায়। নিজের ব্যাপারে এই সিদ্ধান্তটা সততার সঙ্গে নিন, কারণ মাঝপথে ছেড়ে ফিরে আসা কারও পক্ষেই ভালো নয়।
ফেরাটাই এই পথের আসল চাবি
এই কথাটা আমরা জোর দিয়ে লিখছি, কারণ এটাই সেই জায়গা, যেখানে মানুষ একটা ভালো সুযোগ নিজের হাতে নষ্ট করে।
যে কর্মী সময়মতো ফিরে যায়, অপারেটররা তাকে পরের বছর আবার ডাকে। এমন অনেকে আছেন, যারা প্রতি বছর যান, আর এই ধারা তাদের পরিবারের স্থায়ী আয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছয় মাস কাজ, ছয় মাস বাড়ি, আর পরের বছর আবার একই। এতে কোনো লুকোনো শর্ত নেই — শুধু ফেরা।
আর যে থেকে যায়, সে সবকিছু হারায়। যুক্তরাজ্যে কাগজবিহীন জীবন কেমন, তার পুরো চিত্র আমরা UK-র প্রথম লেখায় লিখে দিয়েছি: বৈধ কাজ বন্ধ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ, বাড়ির ভাড়ার চুক্তি বন্ধ। তার সঙ্গে ভবিষ্যতের আবেদনে দশ বছর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তো আলাদাই।
কিন্তু ক্ষতি এখানেই শেষ নয়, আর এই অংশটা মানুষ ভাবে না। অপারেটররা জানে কোন এলাকা থেকে আসা কর্মীরা ফেরত যায় না। একজন মানুষের থেকে যাওয়ায় তার গ্রাম আর এলাকার পরের প্রার্থীদের পথ সরু হয়ে যায়। অর্থাৎ আপনি নিজের সঙ্গে সঙ্গে সেই তরুণের সুযোগটাও শেষ করে দেন, যে পরের বছর ওই একই দরজায় কড়া নাড়তে যাচ্ছিল।
তাই এই ভিসাটাকে পরিষ্কার চোখে দেখুন। এটা যুক্তরাজ্য “দেখার” বা সেখানে “সেট হওয়ার” দরজা নয়। এটা একটা সৎ মৌসুমি চুক্তি: কাজ করো, রোজগার করো, ফিরে যাও, পরের বছর আবার এসো। এই নিয়তে যাওয়া মানুষের জন্য এটা বছরের পর বছর চলে।

আবেদনের প্রস্তুতি — কাজের কথা
আপনি যদি এই পথ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে থাকেন, তাহলে কাজ আজ থেকেই শুরু হতে পারে, আর এতে কোনো এজেন্টের দরকার নেই।
- gov.uk-এ Seasonal Worker visa-র পাতাটা নিজে পড়ুন — অনুমোদিত অপারেটরদের বর্তমান তালিকা সেখানেই মেলে, আর প্রতিটি অপারেটরের নিজস্ব নিয়োগ সাইটের লিংকও।
- মৌসুমের ঘোষণার দিকে নজর রাখুন, যা সাধারণত শীতের শেষে আর বসন্তে আসে। আবেদন আগে-এলে-আগে-পাবেন নিয়মে চলে, তাই দেরির ক্ষতিটা সত্যিকারের।
- পাসপোর্টের মেয়াদ, পরিষ্কার ক্রিমিনাল রেকর্ড আর TB টেস্ট আগে থেকে তৈরি রাখুন।
- মৌলিক ইংরেজিতে কাজ করুন — এতটুকু, যাতে আপনি নির্দেশ বুঝতে পারেন। ইন্টারভিউতে এটাই দেখা হয়, কোনো পরীক্ষার সার্টিফিকেট নয়।
আর বাড়িতে বা পাড়ায় কেউ যদি বলে “আমার মাধ্যমে তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে” — তাহলে তাকে শুধু একটা প্রশ্ন করুন: কোন অপারেটর, আর তার ওয়েবসাইটের ঠিকানা কী? আসল উত্তর হলে আপনি নিজেও সেখান থেকেই, বিনামূল্যে, রেজিস্টার করতে পারবেন। আর এই মুহূর্তটাতেই কথাটা শেষ হয়ে যায়।
এই লেখা সাধারণ দিকনির্দেশনার জন্য, আইনি পরামর্শ নয়। এই স্কিমের কোটা, অনুমোদিত অপারেটরদের তালিকা আর ফি প্রতি বছর বদলায়, আর এখানে দেওয়া অঙ্কগুলো আনুমানিক। আবেদন সবসময় gov.uk-এ দেওয়া যাচাই করা তালিকা অনুযায়ী, সরাসরি অপারেটরের কাছে দিন — আর নিয়োগের নামে কাউকে একটা টাকাও দেবেন না।