দুনিয়ায় এমন দেশ খুব কম, যেখানে ভালো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি প্রায় শূন্য। জার্মানি এদের মধ্যে সবার আগে। এই কথা আমাদের দেশে মানুষ শুনলে বিশ্বাস করে না — আর যারা বিশ্বাস করে নেয়, তাদের অনেকের পরের প্রশ্নটা হয়: “তাহলে এজেন্ট এত টাকা চায় কেন?”
এই প্রশ্নটাকে ঘিরেই পুরো লেখাটা ঘোরে। কারণ জার্মানির স্টাডি ভিসা দামি নয় — দামি হলো সেই না-জানা, যার কারণে মানুষ নিজের টাকাই অন্যের হাতে তুলে দেয়।
আসুন পুরো ব্যবস্থাটা সোজাসুজি বুঝে নিই: ভর্তি কীভাবে হয়, ব্লকড অ্যাকাউন্ট আসলে কী, পড়াশোনার পাশাপাশি কতটা কাজ করা যায়, আর ডিগ্রির পরে জার্মানি আপনাকে কী দেয়।
আগে ঠিক করুন আপনি কোন দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন
জার্মানির শিক্ষাব্যবস্থা আপনার বর্তমান পড়াশোনাকে নিজেদের মাপকাঠিতে মাপে, আর এটাই প্রথম ধাপ, যেখানে মানুষ ভুল আন্দাজ করে বসে।
আপনি যদি মাস্টার্স করতে চান আর ষোলো বছরের পড়াশোনা সম্পূর্ণ, তাহলে আপনি সবচেয়ে খোলা পথে আছেন। জার্মানিতে শত শত মাস্টার্স প্রোগ্রাম পুরোপুরি ইংরেজিতে পড়ানো হয়, আর উপমহাদেশের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ এই পথেই যায়।
আপনি যদি ব্যাচেলর্স করতে চান, তবে ব্যাপারটা একটু আলাদা। বারো বছরের পড়াশোনার পর জার্মানি সরাসরি ভর্তি নেয় কেবল তখনই, যখন স্কুলিং আর ফলাফল তাদের মানে পৌঁছায়। পাকিস্তানি ইন্টারের পরে সাধারণত হয় Studienkolleg (এক বছরের ফাউন্ডেশন কোর্স) করতে হয়, নয়তো পাকিস্তানে এক-দুই বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে যেতে হয়।
এটা আন্দাজে ঠিক করবেন না। জার্মানির কাছে ঠিক এই কাজের জন্যই একটা সরকারি ডেটাবেস আছে — anabin.kmk.org — যেখানে আপনি নিজের বিশ্ববিদ্যালয় আর নিজের ডিগ্রির অবস্থান নিজেই দেখে নিতে পারেন। এটা বিনামূল্যে, আর যে কেউ দেখতে পারে। এজেন্টের কাছে যাওয়ার আগে দশ মিনিট এখানে দিন; তার পরে আপনার কথাবার্তাই একেবারে বদলে যাবে।
ভর্তি — ভিসা আসে এর পরে, আগে নয়
ক্রমটা মনে রাখুন: আগে প্রোগ্রাম, তারপর ভর্তি, তারপর টাকা, তারপর ভিসা। যে লোক আপনার কাছে “ভিসার” টাকা চাইছে অথচ ভর্তির কথাই বলছে না, সে ব্যবস্থার উল্টো পথে চলছে।
প্রোগ্রাম খোঁজার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জায়গা daad.de — এটি জার্মান সরকারি শিক্ষা সংস্থা, আর এর ডেটাবেসে প্রায় প্রতিটি প্রোগ্রাম আছে, স্কলারশিপের তথ্যসহ। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি আবেদন নেয় না, নেয় uni-assist.de-র মাধ্যমে, যেখানে প্রতিটি আবেদনে একটা নির্ধারিত ফি লাগে। এই ফি হয় কয়েক ডজন ইউরোর, লাখ লাখের নয়।
ভাষার প্রমাণ প্রোগ্রাম অনুযায়ী: ইংরেজি প্রোগ্রামের জন্য IELTS বা TOEFL, জার্মান প্রোগ্রামের জন্য TestDaF বা DSH।
আর একটা ব্যবহারিক কথা, যা প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায় — সময়। জার্মানির সেশন শুরু হয় অক্টোবর আর এপ্রিলে, আর দূতাবাসের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিজেই এক লম্বা অপেক্ষা। কয়েক মাস আগে শুরু করুন। ভর্তি হাতে আছে অথচ অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিলছে না — এটা সবচেয়ে কষ্টের অবস্থা, আর পুরোপুরি এড়ানো যায়।

ব্লকড অ্যাকাউন্ট — এই টাকা আপনার, কারও ফি নয়
এই অংশটা সবচেয়ে মন দিয়ে পড়ুন, কারণ জার্মানির ভিসা নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা জন্মায় এখানেই।
ভিসা দেওয়ার আগে জার্মানি নিশ্চিত হতে চায় যে আপনার কাছে এক বছরের খরচ আছে। এর জন্য এক বিশেষ ধরনের অ্যাকাউন্ট খোলা হয়, যাকে বলে Sperrkonto বা ব্লকড অ্যাকাউন্ট। নির্ধারিত টাকা — মোটা আন্দাজে বছরে প্রায় এগারো থেকে বারো হাজার ইউরো, আর সঠিক অঙ্ক প্রতি বছর বদলায় — এই অ্যাকাউন্টে জমা হয়।
এবার আসল কথা। এই টাকা কোথাও চলে যায় না। জার্মানি পৌঁছানোর পরে এই টাকাই আপনি মাসিক কিস্তিতে ফেরত পান, আর নিজের ভাড়া, খাওয়া আর ইনস্যুরেন্স এটা দিয়েই চালান। এটা ফি নয়, জরিমানা নয়, কাউকে দেওয়ার টাকা নয় — এটা আপনার নিজেরই খরচ, যা শুধু একটা নিরাপদ অ্যাকাউন্টে রাখা হচ্ছে।
যেদিন আপনি এই কথাটা বুঝে যাবেন, সেদিনই “ব্লকড অ্যাকাউন্টের সেটিং করিয়ে দেব” বলা প্রতিটি এজেন্টের মুখোশ খুলে যাবে। অ্যাকাউন্ট খোলে কেবল কয়েকটি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান, টাকা হতে হবে আপনার নিজের নামে আর আপনার নিজেরই, আর এতে “সেটিং” নামের কোনো জিনিসের অস্তিত্বই নেই।
টাকা যদি আপনার কাছে না থাকে, তবে দুটো বৈধ বিকল্প আছে: কোনো স্কলারশিপ (DAAD আর অনেক সংস্থা দেয়), অথবা জার্মানিতে বসবাসকারী কোনো স্পনসরের Verpflichtungserklärung — অর্থাৎ একটা আনুষ্ঠানিক আইনি অঙ্গীকার যে তিনি আপনার খরচ বহন করবেন। দুটো পথই সরকারি আর দুটোর জন্যই ফর্ম আছে।
পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ — অনুমতি আছে, তবে সীমাসহ
জার্মানিতে একজন শিক্ষার্থী বছরে ১৪০টি পুরো দিন, বা ২৮০টি অর্ধেক দিন কাজ করার অনুমতি পান। কাজের ভাষায় এটা দাঁড়ায় সপ্তাহে প্রায় বিশ ঘণ্টার কাছাকাছি। ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় বারো ইউরোর ওপরে, আর তা প্রতি বছর বাড়ে।
কাজ মেলে কোথায়? সবচেয়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের চাকরিগুলো, যেগুলোকে বলে HiWi — এগুলো আপনার পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত থাকে আর সিভিতেও কাজে লাগে। এছাড়া রেস্তোরাঁ, গুদাম আর ডেলিভারির কাজ সাধারণ।
তবে একটা পরামর্শ, যা প্রত্যেক পুরোনো শিক্ষার্থী দেন: প্রথম সেমিস্টার পড়াশোনায় দিন। জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষায় ফেল করা সহজ — এটা আমাদের দেশের ব্যবস্থার মতো নয়, যেখানে কোনো না কোনোভাবে পার হওয়া যায়। আর আপনার ভিসা বাঁধা আপনার পড়াশোনার অগ্রগতির সঙ্গে। ক্রেডিট পিছিয়ে পড়লে নবায়নের সময় সমস্যা হয়। কাজ পালিয়ে কোথাও যাচ্ছে না; সেমিস্টার যেতে পারে।
ডিগ্রির পরে — এটাই জার্মানির আসল উপহার
অনেক দেশ আপনাকে পড়তে দেয় আর ডিগ্রির দিনই ফেরার টিকিট ধরিয়ে দেয়। জার্মানি তা করে না, আর এই জিনিসটাই দেশটাকে বাকি সবার থেকে আলাদা করে।
ডিগ্রি শেষ হতেই আপনি পান আঠারো মাসের জব সার্চ পারমিট। এই সময়ে আপনি চাকরি খুঁজতে পারেন, আর এর মধ্যে যেকোনো ধরনের কাজও করতে পারেন — অর্থাৎ খুঁজতে খুঁজতে উপোস থাকতে হয় না। দেড় বছর যেকোনো সিরিয়াস গ্র্যাজুয়েটের জন্য যথেষ্ট সময়।
এর পরে যদি নিজের ডিগ্রি-সংশ্লিষ্ট চাকরি নির্ধারিত বেতনে পেয়ে যান, তবে খোলে EU Blue Card-এর পথ। জার্মান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়া মানুষদের জন্য এই পথ তুলনায় সহজ। আর ব্লু কার্ডে স্থায়ী বসবাস মিলতে পারে একুশ থেকে সাতাশ মাসে — মেয়াদটা নির্ভর করে আপনার জার্মান ভাষার স্তরের ওপর। অর্থাৎ যত ভালো জার্মান, তত তাড়াতাড়ি স্থায়ী বসবাস।
জার্মানি থেকে পড়া শিক্ষার্থীদের চাকরি পাওয়ার হার খুব উঁচু, বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং, আইটি আর অর্থনীতির খাতে। এটা কাকতালীয় নয় — জার্মান অর্থনীতির এই খাতগুলোতেই মানুষ দরকার, আর দেশটা জেনেবুঝে এই পথ খোলা রেখেছে। চাকরির বাজার, যোগ্যতার স্বীকৃতি আর বেতনের খুঁটিনাটি আমরা জার্মানিতে চাকরি ও Anerkennung লেখায় আলাদা করে লিখেছি।

খরচের আসল নকশা
এগুলো আন্দাজ, আর শহরভেদে বদলায়, কিন্তু ঘরে বসে হিসাব কষার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট:
- টিউশন ফি: সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শূন্য। শুধু সেমিস্টার ফি থাকে, প্রায় ১৫০ থেকে ৩৫০ ইউরো, যার মধ্যে প্রায়ই শহরের ট্রান্সপোর্ট পাস ধরা থাকে। (একটা ব্যতিক্রম আছে — Baden-Württemberg রাজ্য EU-র বাইরের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আলাদা ফি নেয়, তাই নিজের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।)
- রুম: ছোট শহরে মাসে প্রায় ৩০০ থেকে ৪৫০ ইউরো। মিউনিখ, বার্লিন আর হামবুর্গে এর চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি। সবচেয়ে সস্তা থাকার জায়গা সরকারি স্টুডেন্ট হোস্টেল (Studentenwerk)-এর — কিন্তু অপেক্ষার তালিকা লম্বা, তাই ভর্তির দিনই আবেদন করে দিন।
- হেলথ ইনস্যুরেন্স: বাধ্যতামূলক, এটা ছাড়া ভর্তি সম্পূর্ণ হয় না। শিক্ষার্থীদের রেট মাসে প্রায় ১২০ থেকে ১৩০ ইউরো।
- খাওয়া আর দৈনন্দিন খরচ: মাসে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ ইউরো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া (Mensa) বাইরের তুলনায় অনেক সস্তা।
এই সব যোগ করলে পরিষ্কার দেখা যায়, ব্লকড অ্যাকাউন্টের অঙ্কটা মনগড়া কিছু নয় — এটা প্রায় সেটাই, যা এক বছরে সত্যিই খরচ হয়।
মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে যেখানে
ভুয়া ভর্তি বা ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট। জার্মান দূতাবাসগুলো কাগজ যাচাইয়ে কঠোর, আর তারা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরাসরি যাচাই করে। ধরা পড়লে শুধু প্রত্যাখ্যান হয় না — লম্বা নিষেধাজ্ঞা লাগে, আর সেই নিষেধাজ্ঞা প্রভাব ফেলে পুরো শেনজেনের ওপর। একটা মিথ্যা কাগজের দাম কয়েক বছর।
“ভিসা গ্যারান্টি” দেওয়া কনসালট্যান্ট। কেউই জার্মান ভিসার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, কারণ সিদ্ধান্ত নেয় দূতাবাস আর ব্যবস্থা সবার জন্য এক। যে কাজের জন্য লাখ লাখ চাওয়া হচ্ছে, তা প্রায়ই সেই ফর্মগুলোই পূরণ করা, যা আপনি নিজেই পূরণ করতে পারেন — আর নিজে পূরণ করলে ইন্টারভিউতে নিজের ফাইলটাও বোঝাতে পারবেন।
শুধু ইংরেজির ওপর ভরসা করা। এটা প্রতারণা নয়, ভুল আন্দাজ, কিন্তু ক্ষতি হয় ততটাই। ডিগ্রি ইংরেজিতে হলেও চাকরির বাজারে অগ্রাধিকার সে-ই পায়, যার জার্মান B1 বা তার ওপরে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভাষার নিজস্ব কোর্স থাকে, প্রায়ই বিনামূল্যে বা নামমাত্র ফিতে। প্রথম দিন থেকেই শুরু করে দিন; আঠারো মাসের জব সার্চ পারমিটের সময় এই জিনিসটাই ফারাক গড়ে দেয়।
পড়াশোনা ছেড়ে কাজে ডুবে যাওয়া। প্রতি বছর কিছু মানুষ এটা করে: বেতন হাতে আসে, ক্লাস পিছিয়ে যায়। ফল দাঁড়ায় এই — ক্রেডিট পূরণ হয় না, পারমিটের নবায়ন আটকে যায়, আর যে মানুষটা বৈধভাবে এসেছিল, সে অবৈধ হওয়ার কিনারায় পৌঁছে যায়। আপনি সেখানে আছেন শিক্ষার্থীর পরিচয়ে; সেই পরিচয়ই আপনার সুরক্ষা।
সরকারি ওয়েবসাইট — যাচাই করুন এখান থেকেই
- প্রোগ্রাম ও স্কলারশিপ: daad.de
- আবেদন: uni-assist.de
- ডিগ্রির অবস্থান: anabin.kmk.org
এখানে লেখা প্রতিটি কথা সাধারণ দিকনির্দেশনা হিসেবে — এটা আইনি পরামর্শ নয়। ব্লকড অ্যাকাউন্টের অঙ্ক, সেমিস্টার ফি আর ভর্তির নিয়ম প্রতি বছর বদলায়, আর প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শর্তও থাকে। আবেদন করার আগে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট আর জার্মান দূতাবাসের হালনাগাদ নির্দেশনা অবশ্যই পড়ে নিন।